প্রিন্ট এর তারিখ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
টাকা তোলার সুযোগ মিললেও সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক থেকে নিচ্ছেন না বেশির ভাগ গ্রাহক
শেখ মো: বেলায়েত হোসেন, রিপোর্টার ||
দীর্ঘদিন আমানত
ফেরত না পাওয়া, তারল্যসংকট
ও দুর্বল আর্থিক ভিত্তির কারণে পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করে গঠন করা
হয়েছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। কার্যক্রম শুরুর আগে নতুন ব্যাংকটির
গ্রাহকদের মধ্যে আমানত নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি
হয়েছিল। তবে আমানত ফেরত
দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর
এখন পর্যন্ত সেই আশঙ্কার বড়
প্রতিফলন দেখা যায়নি।বরং গ্রাহকদের
অর্থ উত্তোলনের চাপ প্রত্যাশার তুলনায়
অনেক কম। ব্যাংকটি প্রতিদিন
যে পরিমাণ অর্থ ফেরতের প্রস্তুতি
রাখছে, গ্রাহকেরা তার অর্ধেকও তুলছেন
না। পাশাপাশি নতুন করে আমানতও
জমা হচ্ছে। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ
সংশ্লিষ্টদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট
ব্যক্তিরা বলছেন, পুনর্গঠিত ব্যাংকটির সামনে প্রথম বড় পরীক্ষা ছিল
আমানতকারীদের আস্থা ফেরানো। এখন পর্যন্ত সেই
পরীক্ষায় ইতিবাচক ফল পাওয়া যাচ্ছে।
তবে এই আস্থা ধরে
রাখা এবং ব্যাংকটিকে টেকসই
অবস্থানে নিয়ে যাওয়াই এখন
বড় চ্যালেঞ্জ।৫
হাজার কোটি টাকার বিশেষ
সহায়তাবাংলাদেশ ব্যাংকের
মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক
আরিফ হোসেন খান বলেন, সম্মিলিত
ইসলামী ব্যাংকের জন্য সবচেয়ে বড়
চ্যালেঞ্জ ছিল আমানতকারীদের আস্থা
পুনরুদ্ধার। একীভূত হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর
আর্থিক দুর্বলতা ও তারল্যসংকট নিয়ে
দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা ছিল।
বিশেষ করে আমানত ফেরত
পেতে গ্রাহকদের ভোগান্তি জনমনে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করেছিল।তাঁর ভাষ্য,
নতুন ব্যাংক হিসেবে কার্যক্রম শুরুর পর গ্রাহকেরা একযোগে
আমানত তুলে নিতে শুরু
করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে
পারত। তবে এখন পর্যন্ত
তেমন পরিস্থিতি দেখা যায়নি।আরিফ হোসেন
খান জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সম্মিলিত ইসলামী
ব্যাংককে একসঙ্গে ৫ হাজার কোটি
টাকা দেওয়া হয়েছে। কার্যক্রম শুরুর পর ব্যাংকটি যাতে
তারল্যসংকটে না পড়ে, সে
জন্য অর্থের সংস্থান ও ব্যবস্থাপনার ওপর
গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আমানত ফেরতের প্রক্রিয়াকে একটি কাঠামোর মধ্যে
আনা হয়েছে।দেড়
হাজার কোটিও তোলেননি গ্রাহকেরাএকীভূত হওয়া
পাঁচ ব্যাংক হলো এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক।এর মধ্যে
এক্সিম ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করতেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-ঘনিষ্ঠ
ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম মজুমদার। বাকি চারটি ব্যাংকের
নিয়ন্ত্রণ ছিল এস আলম
গ্রুপের মালিক সাইফুল আলমের হাতে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে
এসব ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে
ঋণ নিয়ে হাজার হাজার
কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ
ওঠে। আর্থিক সংকটের কারণে ব্যাংকগুলো একপর্যায়ে আমানত ফেরত দেওয়া ও
দৈনন্দিন লেনদেন পরিচালনায় সমস্যায় পড়ে।এ অবস্থায়
গত বছরের ডিসেম্বরে পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী
ব্যাংক গঠন করে অন্তর্বর্তী
সরকার। নতুন ব্যাংকটির পরিশোধিত
মূলধন নির্ধারণ করা হয় ৩৫
হাজার কোটি টাকা। এর
মধ্যে সরকার ২০ হাজার কোটি
টাকা জোগান দেয়। বাকি ১৫
হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের
শেয়ার হিসেবে দেওয়ার কথা জানায় বাংলাদেশ
ব্যাংক।একীভূত কার্যক্রম
শুরুর পর আমানত বীমা
তহবিল থেকে গ্রাহকদের ২
লাখ টাকা পর্যন্ত দেওয়ার
সিদ্ধান্ত হয়। পুরো আমানত
ফেরতের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক
একটি স্কিমও ঘোষণা করে।এর মধ্যে
আমানতের ওপর মুনাফা কর্তন
বা ‘হেয়ারকাট’ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া
হলেও পরে গ্রাহকদের চাপের
মুখে তা থেকে সরে
আসে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ২৫ আগস্ট
গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান
জানান, আমানতের ওপর কোনো হেয়ারকাট
প্রযোজ্য হবে না। একই
সঙ্গে ৭ সেপ্টেম্বর থেকে
আমানতকারীরা প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ তুলতে পারবেন
বলেও জানানো হয়।এর পর
ধারণা করা হয়েছিল, গ্রাহকেরা
বিপুল পরিমাণ অর্থ তুলে নিতে
ব্যাংকে ভিড় করবেন। সে
জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নতুন ব্যাংকটিকে
৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ
তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়। কিন্তু এখন
পর্যন্ত গ্রাহকেরা দেড় হাজার কোটি
টাকাও তোলেননি।৫
হাজার ৫১১ কোটি টাকার
আবেদনের বিপরীতে উত্তোলন ১ হাজার ৪৩১
কোটিব্যাংক সূত্রে
জানা গেছে, গত ১ সেপ্টেম্বর
১৮ হাজার ৪৬ জন গ্রাহক
মোট ১ হাজার ৩২৫
কোটি টাকা ফেরতের আবেদন
করেন। ৭ সেপ্টেম্বর অর্থ
ফেরতের প্রথম দিনে ৮ হাজার
১২৫ জন গ্রাহক ৩১৯
কোটি টাকা উত্তোলন করেন।২ সেপ্টেম্বর
১৯ হাজার ৬১৩টি আবেদনের বিপরীতে ৮ সেপ্টেম্বর টাকা
তুলতে আসেন ৭ হাজার
২৩৪ জন। ১ হাজার
১৬ কোটি টাকা চাহিদার
বিপরীতে ওই দিন উত্তোলন
হয় ৩৪০ কোটি টাকা। ৩ সেপ্টেম্বর
আবেদন করা ২১ হাজার
৮৬ জন গ্রাহকের ৯২৩
কোটি টাকা ফেরত দেওয়ার
কথা ছিল ৯ সেপ্টেম্বর।
সেদিন ১০ হাজার ৬৯৭
জন গ্রাহক ৩৮১ কোটি টাকা
উত্তোলন করেন।সর্বশেষ ৬
সেপ্টেম্বর আবেদন করা ১৫ হাজার
৪৭৬ জন গ্রাহকের ৬৫৭
কোটি টাকা ফেরত দেওয়ার
কথা ছিল। এর বিপরীতে
৯ হাজার ৪১ জন গ্রাহক
উত্তোলন করেন ৩৯১ কোটি
টাকা।সব মিলিয়ে
১ থেকে ১০ সেপ্টেম্বর
পর্যন্ত ১ লাখ ২৪
হাজার ৮৭৭ জন গ্রাহক
মোট ৫ হাজার ৫১১
কোটি টাকা ফেরতের আবেদন
করেন। এর মধ্যে এখন
পর্যন্ত ৩৫ হাজার ৯০৭
জন গ্রাহক ১ হাজার ৪৩১
কোটি টাকা তুলেছেন। অর্থাৎ
আবেদন করা অর্থের প্রায়
তিন-চতুর্থাংশই এখনো উত্তোলন করা
হয়নি।নতুন
আমানতও আসছেআমানত ফেরতের
জন্য আবেদন করেও অনেক গ্রাহক
টাকা না নেওয়াকে ব্যাংকের
প্রতি আস্থার লক্ষণ হিসেবে দেখছেন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আবেদুর রহমান
সিকদার।তিনি বলেন,
তাঁরা ধারণা করেছিলেন আরও অনেক বেশি
গ্রাহক অর্থ উত্তোলনের আবেদন
করবেন। কিন্তু আবেদনকারীর সংখ্যা প্রত্যাশার তুলনায় কম। আবার আবেদনকারীদের
বড় একটি অংশ অর্থ
উত্তোলনও করছেন না।আবেদুর রহমান
সিকদার বলেন, ব্যাংকের শাখা থেকে গ্রাহকদের
ফোন করা হলে অনেকে
টাকা না তোলার কথা
জানিয়েছেন। তাঁর মতে, এর
অর্থ হলো গ্রাহকদের মধ্যে
ব্যাংকের প্রতি আস্থা ফিরছে। মাসিক স্কিমের অর্থও দেওয়া হচ্ছে। ক্যাশের পাশাপাশি আরটিজিএস, বিএফটিএন ও ক্লিয়ারিং চালু
হয়েছে।ব্যাংকটির এমডি
জানান, অর্থ ফেরত কার্যক্রম
শুরুর পর নতুন আমানতও
আসছে। ৭ সেপ্টেম্বর ব্যাংকে
১৪১ কোটি টাকা, ৮
সেপ্টেম্বর ১৯৫ কোটি টাকা,
৯ সেপ্টেম্বর ২৪৪ কোটি টাকা
এবং ১০ সেপ্টেম্বর ৩১৪
কোটি টাকা জমা হয়।
অর্থাৎ এই চার দিনে
নতুন করে মোট ৮৯৪
কোটি
টাকা আমানত
এসেছে।সামনে
বড় চ্যালেঞ্জ পুনর্গঠনআর্থিক সংকটে
পড়া ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখতে একীভূতকরণের পরিকল্পনা করেছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ
মনসুর। তখন নতুন ব্যাংকটিকে
পুনর্গঠন করে এসএমই খাতকেন্দ্রিক
এবং উপজেলা পর্যায়ে বিস্তৃত করার কথা বলা
হয়েছিল।একীভূত হওয়া
পাঁচ ব্যাংকের সম্মিলিত জনবল প্রায় ১৬
হাজার। শাখা রয়েছে ৭৫৯টি।
এর বাইরে প্রায় ৭০০টি উপশাখা রয়েছে। অনেক এলাকায় একাধিক
ব্যাংকের শাখা ও উপশাখা
পাশাপাশি রয়েছে। কোথাও তিন-চারটি ব্যাংকের
শাখা রয়েছে, আবার কোনো কোনো
এলাকায় পাঁচ ব্যাংকেরই শাখা
বা উপশাখা রয়েছে।ফলে শাখা-উপশাখার পুনর্বিন্যাস এবং অতিরিক্ত জনবল
ব্যবস্থাপনা এখন নতুন ব্যাংকটির
বড় পরীক্ষা।এমডি মো.
আবেদুর রহমান সিকদার জানান, চলতি মাসেই সম্মিলিত
ইসলামী ব্যাংকের নামে একটি মডেল
শাখা চালু করা হবে।
সেখানে সব ব্যাংকের কার্যক্রম
পরিচালিত হবে। তবে পাঁচ
ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সিস্টেম
একীভূত করে নতুনভাবে সাজাতে
সময় প্রয়োজন। নতুন করে সুইফট
কোডও প্রয়োজন হবে।ব্যাংক
খাতে আস্থার বার্তাঅর্থ ফেরতের
সুযোগ পাওয়ার পরও উত্তোলনের হার
কম থাকাকে আশাব্যঞ্জক হিসেবে দেখছেন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের
(এবিবি) চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিন।তিনি বলেন,
নানা সংকটের পরও ব্যাংকগুলোর ওপর
সাধারণ গ্রাহকদের আস্থা পুরোপুরি নষ্ট হয়নি। সংকট
মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারের নেওয়া
সময়োপযোগী পদক্ষেপের ওপর মানুষের আস্থাও
এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে।মাসরুর আরেফিনের
মতে, জনবল ও অবকাঠামো
পুনর্গঠন এখন সম্মিলিত ইসলামী
ব্যাংকের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সঠিক
দিকনির্দেশনা ও ব্যবস্থাপনা পেলে
ব্যাংকটি দ্রুত আরও স্থিতিশীল হয়ে
উঠতে পারে।দেশের ব্যাংক
খাতে দীর্ঘদিন ধরে অর্থ লোপাট
ও ঋণখেলাপির বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬
সালের জুন শেষে ব্যাংক
খাতে খেলাপি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে
৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা
ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ।একীভূত হওয়া
পাঁচ ব্যাংক এ ক্ষেত্রে বড়
ভুক্তভোগী। জুনের তথ্য অনুযায়ী, তাদের
সম্মিলিত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৬৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা, যা পুরো ব্যাংক
খাতের খেলাপি ঋণের এক-চতুর্থাংশেরও
বেশি।এর মধ্যে
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৬০ হাজার
৬৪৫ কোটি টাকা, এক্সিম
ব্যাংকের ৩৮ হাজার ৫২
কোটি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ২৯ হাজার ৭৯৯
কোটি, ইউনিয়ন ব্যাংকের ২৭ হাজার ১৩৪
কোটি এবং গ্লোবাল ইসলামী
ব্যাংকের ১৪ হাজার ২১৯
কোটি টাকা।এ পরিস্থিতির
মধ্যেও নতুন ব্যাংকটির প্রতি
আমানতকারীদের আস্থা ফেরাকে ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদেরা।সেন্টার ফর
পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ও বাংলাদেশ
ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ড. ফাহমিদা খাতুন
বলেন, ব্যাংক খাত যে পরিস্থিতির
মধ্য দিয়ে গেছে, তার
চেয়ে খারাপ অবস্থা আর হতে পারে
না। এত অনিশ্চয়তার পরও
সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে গ্রাহকেরা ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখছেন এটি ভালো লক্ষণ।
তবে
তাঁর মতে, সম্মিলিত ইসলামী
ব্যাংকের নতুন ব্যবস্থা যাতে
সঠিকভাবে চলে, বিশ্বাসযোগ্যতা বজায়
থাকে এবং পুনর্গঠন প্রক্রিয়া
যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়, তা নিশ্চিত
করতে সরকারের নজরদারি অব্যাহত রাখা জরুরি।
কপিরাইট © ২০২৬ 360 News । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত