প্রিন্ট এর তারিখ : ১৭ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৭ অক্টোবর ২০২৬
অর্থনীতি তিন ধরনের কাঠামোগত ফাঁদে আটকে আছে: হোসেন জিল্লুর
শেখ মো: বেলায়েত হোসেন, রিপোর্টার ||
বাংলাদেশের
অর্থনীতি পরিবার পর্যায়ের আর্থিক সংকট, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং রাজনৈতিক ও
শাসনতান্ত্রিক দুর্বলতা এই তিন ধরনের
কাঠামোগত ফাঁদে আটকে আছে বলে
মন্তব্য করেছেন বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর
রহমান। তাঁর মতে, এটি
সাময়িক কোনো সংকট নয়;
বরং দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর গভীরে প্রোথিত দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা।শনিবার
রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে পিপিআরসি আয়োজিত ‘স্টেট অব দ্য রিয়াল
ইকোনমি’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে
তিনি এসব কথা বলেন।হোসেন
জিল্লুর রহমান বলেন, অর্থনীতির এই সংকটের প্রথম
দিকটি হলো পরিবারগুলোর ক্রমবর্ধমান
আর্থিক চাপ। আগে দারিদ্র্যের
হার কিছুটা কমলেও বর্তমানে তা আবার বাড়তে
শুরু করেছে। বিশেষ করে অতিদারিদ্র্য ও
মাঝারি দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি উদ্বেগজনক।
শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব
দিয়ে মানুষের অর্থনৈতিক দুর্ভোগের পুরো চিত্র বোঝা
সম্ভব নয়।তিনি
বলেন, কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে চাকরির
নিরাপত্তা নেই। পর্যাপ্ত কাজের
সুযোগের অভাবে ছদ্মবেকারত্ব ও আংশিক কর্মসংস্থান
বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি
স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় পরিবারগুলোর ওপর
বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করছে।
অর্ধেকের বেশি পরিবারের অন্তত
একজন সদস্য দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত হওয়ায়
চিকিৎসার খরচ সামলাতে হচ্ছে
নিয়মিত।পিপিআরসির
নির্বাহী চেয়ারম্যান আরও বলেন, পরিবার
পর্যায়ে সঞ্চয়ের তুলনায় ঋণের বোঝা ৪৪
শতাংশের বেশি বেড়েছে। এতে
মানুষের ঋণসংকট আরও গভীর হচ্ছে।
পরিবারগুলোর এই আর্থিক দুরবস্থা
দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ক্ষুদ্র পর্যায়ের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।বিনিয়োগ
ও প্রবৃদ্ধিতে স্থবিরতাঅর্থনীতির
দ্বিতীয় সংকট হিসেবে বিনিয়োগের
স্থবিরতা ও প্রবৃদ্ধির নিম্নমুখী
গতির কথা উল্লেখ করেন
হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, বিশ্বের
অনেক দেশে পরিবার পর্যায়ে
অর্থনৈতিক চাপ থাকলেও বিনিয়োগ
ও প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরিবারগুলোর আর্থিক দুরবস্থার পাশাপাশি বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়েছে এবং
প্রবৃদ্ধির গতিও নিম্নমুখী। বিশ্বব্যাংক,
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও এশীয় উন্নয়ন
ব্যাংকের (এডিবি) মূল্যায়নেও বিনিয়োগের স্থবিরতার বিষয়টি উঠে এসেছে।তৃতীয়
সংকট হিসেবে তিনি রাজনৈতিক ও
শাসনতান্ত্রিক দুর্বলতার কথা বলেন। তাঁর
মতে, অর্থনীতিকে গতিশীল করতে হলে পরিবারগুলোর
আর্থিক কষ্ট কমানো, অর্থনৈতিক
কর্মকাণ্ডে গতি আনা এবং
এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে উপযুক্ত রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক পরিবেশ
নিশ্চিত করা জরুরি।হোসেন
জিল্লুর রহমান বলেন, অর্থনীতির এই কাঠামোগত ফাঁদ
থেকে বের হতে হলে
প্রথমেই স্বীকার করতে হবে যে
দেশ দীর্ঘমেয়াদি সংকটে রয়েছে। শুধু ব্যাংক কমিশন
গঠন কিংবা নতুন নীতিপ্রতিবেদন তৈরি
করে এ সমস্যার সমাধান
সম্ভব নয়। সমাজ, সরকার
ও অর্থনীতিকে সমন্বিত করে একটি সামগ্রিক
উত্তরণ পরিকল্পনার ভিত্তিতে সংস্কার করতে হবে।তৈরি
পোশাক খাতের ওপর অতিনির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণঅনুষ্ঠানে
ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার
অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. ফজলুল হক
বলেন, দেশের অর্থনীতি এককভাবে তৈরি পোশাক খাতের
ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যা
বড় ধরনের ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়।তিনি
বলেন, গত দুই দশক
ধরে চামড়া, ওষুধ ও তথ্যপ্রযুক্তি
(আইটি) খাতকে তৈরি পোশাকের বিকল্প
প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
কিন্তু বাস্তবে রপ্তানিতে পোশাক খাতের অংশ আরও বেড়েছে।
একসময় মোট রপ্তানিতে এ
খাতের অবদান ছিল ৭৩ থেকে
৭৫ শতাংশ, যা বর্তমানে বেড়ে
৮৪ থেকে ৮৫ শতাংশে
দাঁড়িয়েছে।ফজলুল
হকের মতে, অন্যান্য সম্ভাবনাময়
খাতের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হওয়া এবং
রপ্তানি আয়ের উৎস একমুখী
হয়ে পড়া অর্থনীতির জন্য
উদ্বেগজনক। নীতিগত সহায়তা দেওয়ার পরও অন্য খাতগুলো
কেন শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারছে
না, তা নিয়ে গভীর
ও সুনির্দিষ্ট গবেষণা প্রয়োজন।দক্ষতাভিত্তিক
শিক্ষার ওপর গুরুত্বএফবিসিসিআইয়ের
প্রশাসক বলেন, বর্তমানে সনদনির্ভর শিক্ষার চেয়ে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার
প্রয়োজন বেশি। সরকারি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিবছর কতসংখ্যক শিক্ষার্থী প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, সেই পরিসংখ্যান তুলে
ধরা হলেও প্রশিক্ষণ শেষে
কতজন বাস্তবে কর্মসংস্থানে যুক্ত হচ্ছেন, তার যথাযথ মূল্যায়ন
নেই। তিনি এ ধরনের
পরিসংখ্যানকে ‘নম্বর গেম’ বা সংখ্যার
খেলা হিসেবে উল্লেখ করেন।ব্যবসা
ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার সমালোচনা করে ফজলুল হক
বলেন, ধীরগতির ফাইল চলাচল ও
প্রশাসনিক জটিলতার কারণে তরুণেরা ব্যবসায়িক বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন। পুরোনো প্রজন্ম সরকারি দপ্তরে ঘুরে কাজ করতে
অভ্যস্ত হলেও নতুন প্রজন্ম
প্রযুক্তিনির্ভর সহজ ও দ্রুত
সেবা প্রত্যাশা করে।তিনি
আরও বলেন, স্টার্টআপ সংস্কৃতি প্রচলিত আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার বাইরে বিকশিত হওয়ার চেষ্টা করছে। তবে সরকারি দপ্তরে
হয়রানি অব্যাহত থাকলে দীর্ঘ মেয়াদে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে
বড় ধরনের স্থবিরতা তৈরি হতে পারে।অনুষ্ঠানে
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের
(সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর
রহমানসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
কপিরাইট © ২০২৬ 360 News । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত