স্তন ক্যানসারের ঝুঁকিতে কারা, যেসব লক্ষণ অবহেলা করা যাবে না
বিশ্বজুড়ে
নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হওয়া
ক্যানসার স্তন ক্যানসার। তবে
আশার কথা হলো, রোগটি
প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করে যথাযথ চিকিৎসা
শুরু করা গেলে সুস্থ
হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। তাই
স্তনে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে অবহেলা
না করে চিকিৎসকের পরামর্শ
নেওয়া জরুরি।অক্টোবর
স্তন ক্যানসার সচেতনতার মাস। এ বছরের
প্রতিপাদ্য, Every
story is unique, every journey matters।
বাংলায় এর ভাবার্থ প্রতিটি
মানুষের অভিজ্ঞতা আলাদা, সুস্থতার প্রতিটি যাত্রাই গুরুত্বপূর্ণ।২০২৪
সালের বৈশ্বিক হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ২৪ লাখ নারী
নতুন করে স্তন ক্যানসারে
আক্রান্ত হয়েছেন। এ রোগে মারা
গেছেন প্রায় ৬ লাখ ৯৪
হাজার নারী।স্তন
ক্যানসার কীস্তনের
কিছু কোষ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি
পেয়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে এবং
ক্যানসার তৈরি করলে তাকে
স্তন ক্যানসার বলা হয়। নারীদের
মধ্যে এ রোগ বেশি
দেখা গেলেও পুরুষেরও স্তন ক্যানসার হতে
পারে।স্তনে
গাঁট দেখা দিলেই সেটি
ক্যানসার, এমন নয়। আবার
ব্যথা না থাকলেও স্তন
ক্যানসার হতে পারে। শুধু
বয়স্ক নারীরাই এ রোগে আক্রান্ত
হন, এমন ধারণাও ঠিক
নয়; কম বয়সেও স্তন
ক্যানসার হতে পারে। পরিবারের
কারও এ রোগের ইতিহাস
না থাকলেও স্তন ক্যানসার হওয়ার
আশঙ্কা রয়েছে।স্তনে
নতুন বা অস্বাভাবিক পরিবর্তন
দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের
পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ, এসব পরিবর্তন ক্যানসার
ছাড়াও অন্য কারণে হতে
পারে। পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিতভাবে রোগ
নির্ণয় করা সম্ভব নয়।কারা
বেশি
ঝুঁকিতেস্তন
ক্যানসারের ঝুঁকি বিভিন্ন কারণে বাড়তে পারে। এর মধ্যে রয়েছে-·
বয়স
বৃদ্ধি: বয়স
বাড়ার সঙ্গে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকিও
বাড়ে।·
পারিবারিক ইতিহাস: মা,
বোন বা মেয়ের স্তন
ক্যানসার থাকলে ঝুঁকি বাড়তে পারে।·
বংশগত
জিনের
পরিবর্তন: BRCA1 ও
BRCA2-এর মতো জিনের পরিবর্তন
স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।·
অতিরিক্ত ওজন:
বিশেষ করে মেনোপজের পর
অতিরিক্ত ওজন ঝুঁকি বাড়াতে
পারে।·
অ্যালকোহল গ্রহণ:
অ্যালকোহল পান স্তন ক্যানসারের
ঝুঁকি বাড়ায়।·
বুকে
রেডিয়েশন নেওয়ার ইতিহাস: বিশেষত
কম বয়সে বুকে রেডিয়েশন
চিকিৎসা নেওয়া থাকলে ঝুঁকি বাড়তে পারে।·
প্রজনন ও হরমোন-সম্পর্কিত বিষয়: কিছু
প্রজনন বৈশিষ্ট্য ও হরমোন ব্যবহারের
কারণে ঝুঁকির মাত্রা পরিবর্তিত হতে পারে।তবে
নির্দিষ্ট ঝুঁকির কারণ না থাকলেও
স্তন ক্যানসার হতে পারে। প্রায়
৮০ শতাংশ স্তন ক্যানসারের ক্ষেত্রে
নারী হওয়া ও বয়স
বাড়ার বাইরে নির্দিষ্ট কোনো পরিচিত ঝুঁকির
কারণ থাকে না বলে
উল্লেখ করা হয়েছে। তাই
ঝুঁকির কারণ নেই ভেবে
অসচেতন থাকা উচিত নয়।ঝুঁকি
কমাতে
কী
করবেনস্তন
ক্যানসারের সব ঘটনা প্রতিরোধ
করা সম্ভব নয়। তবে কিছু
স্বাস্থ্যকর অভ্যাস এ রোগের ঝুঁকি
কমাতে সহায়তা করতে পারে।·
নিয়মিত
শারীরিক পরিশ্রম করুন।·
স্বাস্থ্যকর
ওজন বজায় রাখুন।·
শাকসবজি,
ফলমূল ও সুষম খাবার
খান।·
অ্যালকোহল
ও ধূমপান এড়িয়ে চলুন।·
চিকিৎসকের
পরামর্শ ছাড়া হরমোনজাতীয় ওষুধ
ব্যবহার করবেন না।·
পরিবারে
স্তন বা ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের
ইতিহাস থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে ঝুঁকি মূল্যায়ন নিয়ে আলোচনা করুন।·
বয়স
ও ব্যক্তিগত ঝুঁকি অনুযায়ী উপযুক্ত স্ক্রিনিং করান।স্বাস্থ্যকর
জীবনযাপন ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করলেও স্তন ক্যানসার সম্পূর্ণভাবে
প্রতিরোধের নিশ্চয়তা দেয় না।কীভাবে শনাক্ত করা
হয়স্তন
ক্যানসার শনাক্ত করতে রোগীর অবস্থা
ও লক্ষণ অনুযায়ী বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়।স্তনের স্বাভাবিক পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতনতা: নিজের
স্তনের স্বাভাবিক আকার, আকৃতি ও অনুভূতি সম্পর্কে
ধারণা রাখা জরুরি। নতুন
কোনো পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসকের
পরামর্শ নিতে হবে।চিকিৎসকের মাধ্যমে পরীক্ষা: প্রশিক্ষিত
চিকিৎসক স্তন ও বগল
পরীক্ষা করে অস্বাভাবিকতা শনাক্ত
করার চেষ্টা করেন।ম্যামোগ্রাফি: স্তনের
বিশেষ এক্স-রে পরীক্ষার
মাধ্যমে কোনো লক্ষণ প্রকাশের
আগেই কিছু ক্যানসার শনাক্ত
করা সম্ভব।আলট্রাসনোগ্রাফি: স্তনের
গাঁট বা অন্য অস্বাভাবিকতা
মূল্যায়নে এ পরীক্ষা ব্যবহার
করা হয়। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে
এটি ম্যামোগ্রাফির বিকল্প হিসেবে নয়, বরং সম্পূরক
পরীক্ষা হিসেবে কাজে লাগে।বায়োপসি: সন্দেহজনক
টিস্যুর নমুনা পরীক্ষা করে ক্যানসার আছে
কি না, তা নিশ্চিত
করা হয়।স্তনে
গাঁট বা অন্য কোনো
সন্দেহজনক লক্ষণ দেখা দিলে স্ক্রিনিংয়ের
জন্য অপেক্ষা করা ঠিক নয়।
এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় রোগনির্ণয়মূলক
পরীক্ষা করাতে হবে।স্তন
ক্যানসার ধরা
পড়লে
করণীয়স্তন
ক্যানসার শনাক্ত হলে আতঙ্কিত না
হয়ে দ্রুত সঠিক রোগনির্ণয় ও
চিকিৎসার পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। রোগের
পর্যায়, টিউমারের বৈশিষ্ট্য এবং রোগীর শারীরিক
অবস্থার ওপর চিকিৎসাপদ্ধতি নির্ভর
করে।চিকিৎসায়
প্রয়োজন অনুযায়ী কয়েকটি পদ্ধতি ব্যবহার করা হতে পারে—·
সার্জারি: উপযুক্ত
রোগীর ক্ষেত্রে টিউমার অপসারণ বা স্তন অপসারণ
করা হয়।·
রেডিওথেরাপি: নির্দিষ্ট
পরিস্থিতিতে ক্যানসার স্থানীয়ভাবে ফিরে আসার ঝুঁকি
কমাতে ব্যবহার করা হয়।·
কেমোথেরাপি: টিউমারের
ধরন, রোগের পর্যায় ও পুনরায় ক্যানসার
হওয়ার ঝুঁকি বিবেচনায় দেওয়া হয়।·
হরমোন
থেরাপি: হরমোন
রিসেপ্টর-পজিটিভ স্তন ক্যানসারের ক্ষেত্রে
ব্যবহার করা হয়।·
টার্গেটেড থেরাপি: HER2 বা
অন্যান্য নির্দিষ্ট বায়োমার্কারের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী এ চিকিৎসা দেওয়া
হতে পারে।·
ইমিউনোথেরাপি: নির্বাচিত
রোগীর ক্ষেত্রে, বিশেষ করে নির্দিষ্ট ধরনের
ট্রিপল-নেগেটিভ স্তন ক্যানসারে, এ
চিকিৎসা ব্যবহার করা হয়।চিকিৎসা
শুরুর আগে প্রয়োজন অনুযায়ী
হিস্টোপ্যাথলজি, ER,
PR, HER2 ও Ki-67 পরীক্ষা করা হয়। নির্দিষ্ট
রোগীর ক্ষেত্রে অন্যান্য বায়োমার্কার বা জেনেটিক পরীক্ষারও
প্রয়োজন হতে পারে।অপ্রয়োজনীয়
চিকিৎসা যেমন ক্ষতিকর, তেমনি
প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে দেরি করাও
বিপজ্জনক। তাই যোগ্য ক্যানসার
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।লেখক:
ডা. মো. তৌছিফুর রহমান,
মেডিকেল অ্যান্ড রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট ও কনসালট্যান্ট, টিএমএসএস
ক্যানসার সেন্টার, বগুড়া।