হিমাগারের অভাবে নষ্ট হচ্ছে কোটি টাকার পেয়ারা
বর্ষা মৌসুমে জমে উঠেছে পিরোজপুরের
নেছারাবাদ ও ঝালকাঠির সীমান্তবর্তী
এলাকার ভাসমান পেয়ারা বাজার। ডিঙি ও পানসি
নৌকায় সাজানো পেয়ারা নিয়ে জমে উঠেছে
বেচাকেনা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা এসে
পেয়ারা কিনছেন। একই সঙ্গে দক্ষিণ
এশিয়ার অন্যতম বড় পেয়ারা বাগান
দেখতে ভিড় করছেন পর্যটকেরা।তবে বাজার জমজমাট
হলেও চাষিদের মুখে স্বস্তি নেই।
ন্যায্য দাম না পাওয়া,
সংরক্ষণের জন্য হিমাগার না
থাকা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের
অভাবে প্রতিবছর লোকসান গুনছেন তাঁরা। এর সঙ্গে ২০২০
সালে পেয়ারা রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায়
আগের মতো লাভ করতে
পারছেন না চাষিরা। তাঁদের
দাবি, আবার বিদেশে পেয়ারা
রপ্তানির সুযোগ তৈরি করা হোক।কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা
গেছে, পেয়ারা সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় মৌসুমে
বিপুল পরিমাণ ফল নষ্ট হয়।
চাষি বিনয় হালদার বলেন,
‘হিমাগারের অভাবে প্রতি বছর কয়েক কোটি
টাকার পেয়ারা নষ্ট হয়।’কুড়িয়ানার কৃষক কালীদাশ মণ্ডলের
চারটি পেয়ারা বাগান রয়েছে। তিনি বলেন, মৌসুমে
তাঁর বাগানগুলো থেকে প্রায় তিন
টন পেয়ারা উৎপাদিত হয়। বর্তমানে প্রতি
মণ ৪০০ থেকে ৫০০
টাকা পাইকারি দরে বিক্রি হচ্ছে।
এতে লাভ খুবই সীমিত।ভাসমান বাজারের আড়তদার আলম-গফুর বলেন,
তাঁরা মণপ্রতি প্রায় ৫০০ টাকা দরে
পেয়ারা কিনে ৬০০ থেকে
৬৫০ টাকায় বিক্রি করেন। পরিবহন ও অন্যান্য খরচ
বাদ দিলে লাভ খুব
বেশি থাকে না।প্রায় ৪ হাজার চাষিবরিশাল বিভাগের নেছারাবাদ উপজেলার সীমান্তবর্তী বানারিপাড়া এবং ঝালকাঠি সদর
উপজেলার কুড়িয়ানা, আটঘর, গণপতিকাঠি, মাদ্রা, আতা, জামুয়া, জৌসার,
মুসলিমপাড়া, শশীদ, আন্দাকুল, আদাবাড়ী, আদমকাঠি, জিন্দাকাঠি, কাঠুরাকাঠি, ধলহার, ডুমুরিয়া, ভিমরুলী, শতদশকাঠি ও বাউকাঠিসহ প্রায়
২৪টি গ্রামে পেয়ারা চাষ হয়। এসব
এলাকায় প্রায় চার হাজার চাষি
পেয়ারা উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত।বরিশাল বিভাগীয় কৃষি অফিসের তথ্য
অনুযায়ী, তিনটি উপজেলায় ২৩টি গ্রামে ৮৭৮
হেক্টর জমিতে প্রায় ৩ হাজার ২২০টি
পেয়ারা বাগান রয়েছে। বাগানের পরিচর্যা থেকে শুরু করে
ফল সংগ্রহ ও বিক্রির সঙ্গে
প্রায় ১৬ হাজার শ্রমজীবী
মানুষ যুক্ত।চাষিদের অন্যতম প্রধান আয়ের উৎস পেয়ারা
চাষ। তবে বাগানের পরিচর্যা,
শ্রমিক ও অন্যান্য খরচ
বেড়ে যাওয়ায় তাঁদের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে। এ অবস্থায় সহজ
শর্তে ব্যাংকঋণের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।একসময় ১৭ দেশে রপ্তানি
হতোস্থানীয় কৃষি ও ব্যবসায়ীদের
তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৭ সালে ব্যাপক
ফলনের পর বাংলাদেশের পেয়ারা
বিদেশে রপ্তানি শুরু হয়। উন্নতমানের
জেলি তৈরির কাঁচামাল হিসেবেও পেয়ারা রপ্তানি করা হতো।একসময় কলম্বিয়া, পর্তুগাল, নেপাল, পাকিস্তান, চীন, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার,
ভুটান, আফগানিস্তান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালদ্বীপ,
বুলগেরিয়া, ইরাক, ইরান ও ইংল্যান্ডসহ
১৭টি দেশে পেয়ারা রপ্তানি
হতো। এতে বছরে প্রায়
৮০ কোটি টাকা রাজস্ব
আয় হতো বলে সংশ্লিষ্টরা
জানান।তবে পচনশীল ফল
সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত হিমাগার
না থাকা, কৃষি বিভাগের অসহযোগিতা
এবং কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাবসহ
বিভিন্ন কারণে ২০২০ সালে পেয়ারা
রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়।পর্যটনে নতুন সম্ভাবনানেছারাবাদ ও ঝালকাঠির সীমান্তবর্তী
খালের মোহনায় গড়ে ওঠা ভাসমান
পেয়ারা বাজারের ঐতিহ্য প্রায় ২০০ বছরের। বর্ষা
মৌসুমে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত
এই এলাকায় পর্যটকদের ভিড় বাড়ে। ডিঙি
ও পানসি নৌকায় ভাসমান বাজার ঘুরে দেখা এবং
পেয়ারা বাগান ভ্রমণ পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ।স্থানীয়রা মনে করেন, পেয়ারা
চাষ, বাজার ও পর্যটনকে সমন্বিতভাবে
গড়ে তোলা গেলে এ
অঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি
হতে পারে।নেছারাবাদ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহাফুজুর
রহমান বলেন, পেয়ারা সংরক্ষণের জন্য সরকারি উদ্যোগে
হিমাগার নির্মাণের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হবে।