আট মাসে ২২৪ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা, বেড়েছে নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যাও
দেশের শিক্ষার্থীদের
মধ্যে আত্মহত্যার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত
আট মাসে দেশের বিভিন্ন
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ২২৪ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা
করেছেন। গত বছরের একই
সময়ে এ সংখ্যা ছিল
১৭৫। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে
আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা
বেড়েছে ৪৯ জন।আত্মহত্যা প্রতিরোধ
ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা
সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশন দেশের
১৬৫টি স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমে
প্রকাশিত সংবাদ পর্যালোচনা করে এ তথ্য
জানিয়েছে।সংগঠনটির হিসাবে,
চলতি বছরের আট মাসে আত্মহত্যা
করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১৩২ জন নারী
এবং ৯২ জন পুরুষ।
২০২৫ সালের একই সময়ে নারী
শিক্ষার্থী ছিলেন ১১৩ জন এবং
পুরুষ ৬২ জন।চলতি বছরে
বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ৫০ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা
করেছেন। মাদরাসা শিক্ষার্থীদের মধ্যেও আত্মহত্যার ঘটনা রয়েছে। এদের
মধ্যে ২৪ জন নারী
ও ২০ জন পুরুষ।আঁচল ফাউন্ডেশনের
আগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩
সালে দেশে ৫১৩ শিক্ষার্থী
আত্মহত্যা করেন। তাঁদের ৬১ শতাংশই ছিলেন
নারী। ২০২৪ সালে আত্মহত্যা
করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৩১০ জন বা
৪৯ দশমিক ৪ শতাংশ ছিলেন
স্কুলশিক্ষার্থী।আজ ১০
সেপ্টেম্বর বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরকারি-বেসরকারি
উদ্যোগে নানা কর্মসূচির মধ্য
দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এ বছরের প্রতিপাদ্য
‘Changing the Narrative on Suicide’ বা
‘আত্মহত্যা নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন’। ২০০৩ সাল
থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিবসটি পালিত
হয়ে আসছে।কেন
বাড়ছে ঝুঁকিমনোরোগ বিশেষজ্ঞদের
মতে, আত্মহত্যার পেছনে একাধিক সামাজিক ও মানসিক কারণ
কাজ করতে পারে। বিষণ্ণতা,
উদ্বেগ, পারিবারিক ও সামাজিক চাপ,
সম্পর্কের টানাপোড়েন, আর্থিক সংকট, একাকিত্ব, নির্যাতন, যৌন হয়রানি, মাদকাসক্তি
এবং প্রিয়জন হারানোর মতো ঘটনা কাউকে
আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিতে
পারে।সামাজিক অবক্ষয়,
পারিবারিক ও দাম্পত্য কলহ,
বেকারত্ব, প্রেম-ভালোবাসা এবং বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কও
আত্মহত্যার কারণ হিসেবে চিহ্নিত
করেছেন বিশেষজ্ঞরা। শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এর সঙ্গে যুক্ত
হচ্ছে অতিরিক্ত একাডেমিক চাপ এবং ভবিষ্যৎ
ও ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তা।বিশেষজ্ঞরা বলছেন,
আত্মহত্যার আগে অনেকের আচরণে
পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।
হঠাৎ নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, সামাজিক যোগাযোগ কমিয়ে দেওয়া, দীর্ঘ সময় হতাশায় থাকা,
নিজেকে মূল্যহীন মনে করা কিংবা
আত্মহত্যার কথা বলা—এসব
সতর্কসংকেত হতে পারে। এসব
লক্ষণ দ্রুত শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় মানসিক
স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গেলে আত্মহত্যা
প্রতিরোধ করা সম্ভব।দেশে
আত্মহত্যার সামগ্রিক চিত্রও উদ্বেগজনকপুলিশের তথ্য
অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪
সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে দেশে
৭৬ হাজার ৩৬১ জন আত্মহত্যা
করেছেন। এ সংখ্যা বিশ্ব
স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২১ সালের অনুমিত
হিসাবের তিন গুণেরও বেশি।জাতীয় আত্মহত্যা
প্রতিরোধ পরিকল্পনা ২০২৬–৩০-এর
খসড়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২২
সালে দেশে আত্মহত্যার ঘটনা
ছিল সর্বোচ্চ ১৬ হাজার ৮৮৬টি।
২০২৪ সালে তা কমে
দাঁড়ায় ১৩ হাজার ৯৭৫টিতে।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের
অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির
আর্থিক সহায়তায় সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন
অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) পরিচালিত জাতীয় জরিপে বলা হয়েছে, ২০২৩
সালে দেশে ২০ হাজার
৫০৫ জন আত্মহত্যা করেন।
অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ৫৬ জনের
মৃত্যু হয়েছে আত্মহত্যায়।বিশ্ব স্বাস্থ্য
সংস্থার হিসাবে, বিশ্বে প্রতিবছর সাত লাখের বেশি
মানুষ আত্মহত্যায় মারা যায়। এর
প্রায় ৭৭ শতাংশ ঘটনা
ঘটে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের
দেশগুলোতে। ১৫ থেকে ২৯
বছর বয়সীদের মৃত্যুর অন্যতম কারণও আত্মহত্যা।বাংলাদেশে নারীদের
মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি। বিশেষ করে ১০ থেকে
২৯ বছর বয়সী নারীদের
মধ্যে আত্মহত্যার হার দক্ষিণ এশিয়ার
দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ বলে উল্লেখ করা
হয়েছে।শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও
মানসিক স্বাস্থ্যসেবার দাবিআঁচল ফাউন্ডেশনের
সভাপতি তানসেন রোজ বলেন, শিক্ষার্থীদের
আত্মহত্যা প্রতিরোধে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা
ও নিয়মিত মেন্টাল হেলথ স্ক্রিনিং চালু
করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষক
ও সহপাঠীদের মানসিক চাপ, বিষণ্ণতা ও
উদ্বেগের লক্ষণ শনাক্ত করার বিষয়ে প্রশিক্ষণ
দেওয়া দরকার।অভিভাবকদের সম্পৃক্ত
করে নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্যসচেতনতামূলক কার্যক্রম চালুর ওপরও গুরুত্ব দেন
তিনি।
তানসেন
রোজ বলেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধ কোনো একক ব্যক্তি
বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়। সংকটে থাকা
একজন তরুণকে সহায়তা করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান,
স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা, সরকার, গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনসহ
পুরো সমাজকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।